বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান আলোচনা কর।
- অথবা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ভূমিকা আলোচনা কর।
- অথবা, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান তুলে ধর ।
- অথবা, স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ব্যাখ্যা
কিন্তু কজনকেই মানুষ মনে রেখেছে। যখন কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা সংগঠন জনগণের প্রত্যাশা বা চাহিদা পূরণে নিজের সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে অবিরত কাজ করে তখন তিনিই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, পরিণত হন জনগণের নেতায়।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে এমনি একজন জননেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও শোষণ বৈষম্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন এবং এজন্য বহু নির্যাতন সহ্য করেছেন।
তার অদম্য নেতৃত্বেই বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
তার অসাধারণ নেতৃত্ব গুণে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হয়। নিম্নে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ভূমিকা আলোচনা করা হলো :
কেননা যেকোনো- যুদ্ধের সূচনায় এরকম ঘোষণা জনগণের মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে দুটি দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে শুরু হয়।
একটি আমেরিকায় এবং অপরটি বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রারম্ভে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন ।
তিনি ১৯৭১ সালের ২ মার্চের প্রথম থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। যা জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।
জনগণ অসহযোগ আন্দোলনের যন্ত্রে উদ্দীপ্ত ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ দলমত নির্বিশেষে একই উদ্দেশ্য সাধনে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলে।
তার ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে লিপ্ত হয় । স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও এই ঐক্য প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। যা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
কেননা জনগণের মধ্যে মুক্তির চেতনা জাগ্রত না করতে পারলে জনগণ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ত না। আর বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে এ কাজটিই করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি তার বলিষ্ঠ কণ্ঠ দিয়ে জনগণকে মুক্তির পথে আহ্বান জাগান এবং তাদের মধ্যে মুক্তির চেতনাকে জাগ্রত করেন। তিনি জনগণের মধ্যে মুক্তির চেতনা সৃষ্টিতে বলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
রক্ত যখন দিয়েছে, রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করেই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ”। তার এই মুক্তির বর্ণনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তকামী জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়।
তিনি বাঙালি জাতিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সংগঠিত হয়ে পাক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করার আহ্বান জানান।
তিনি ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। আমার অনুরোধ প্রত্যেক মহল্লায় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন।
হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।” ঐক্যবদ্ধ জনতা নেতার এ উদাত্ত আহ্বানকে স্বাগত জানায় এবং দেশের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপর থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সংগ্রাম প্রতিরোধ কমিটি গড়ে উঠতে থাকে ।
এক্ষেত্রে তার অসাধারণ নেতৃত্বগুণ প্রশংসনীয়। তিনি জনগণের মাঝে চূড়ান্ত বিজয়ের মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যা মুক্তিযুদ্ধে টনিক হিসেবে কাজ করেছিল।
স্বাধীনতা ঘোষণার সময় তিনি বলেছিলেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছে, আপনাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি এক্ষেত্রে ৬-দফাভিত্তিক আন্দোলনকে সামনে নিয়ে থাকেন। তিনি ১৯৭০ এর নির্বাচনি প্রচারনায়ও ৬-দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ইশতেহার হিসেবে কাজে লাগান।
ফলে জনগণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রারম্ভেও বঙ্গবন্ধু তার ৬- দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জনগণের সামনে তুলে ধরে, ফলে জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টি হয়। যে চেতনা মুক্তিসংগ্রামের পাথেয় হিসেবে কাজ করেছিল ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভাষা, কথা বেতারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছানো হতো। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশ বেতার তার ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করেছিল যা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল আর এ অনুপ্রেরণা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছিল।
তার এ বক্তৃতায় বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়। তিনি তার ঘোষণায় দেশবাসীকে প্রস্তুত হতে আগাম নির্দেশ দিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।
তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বলেন, “৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের কাছে গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো।” এ উক্তির মধ্য দিয়ে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের মধ্যে মুক্তিকামী মানুষের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ।
তিনি যদি জনপ্রিয় না হতেন, তার আন্দোলন যদি বেগবান না হতো তাহলে তাকে এর জন্য চরম পরিণতি ভোগ করতে হতো। এমনকি ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ তাকে পালাতে বলা হলেও তিনি বাংলার জনগণকে বিপদে রেখে পালাননি।
বঙ্গবন্ধুর এই অদম্য সাহসিকতা মুক্তিকামী জনগণের কাছে টনিক হিসেবে অনুপ্রেরণা প্রদান করেছিল। যার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এসব মুক্তিকামী জনগণ স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
যুদ্ধে শুরু হওয়ার পূর্বে তিনি জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ বপন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
অতঃপর বঙ্গবন্ধু চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার নির্দেশিত পথেই নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীকে পর্যদুস্ত করে এবং বিজয় ছিনিয়ে আনে ।
কেননা ছয়- দফা দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনের চাপে পাক সামরিক সরকার আইয়ুব খানের পতন ত্বরান্বিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের পথ প্রশস্ত হয়।
এ গণআন্দোলন বঙ্গবন্ধুকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। কেননা গণআন্দোলনের এগারো দফার ভিত্তিরূপ গ্রহণ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত ছয়-দফা নামক মুক্তির সনদ থেকে ।
ফলে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরালো হয়। কেননা ১৯৭০ এর নির্বাচনের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। আর এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।
যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে । তাই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান অপরিসীম।
সহজ বাংলার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url