সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
উত্তর: সংস্কৃতির স্বরূপ জানার জন্য এর সংজ্ঞার পাশাপাশি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা দরকার। আমরা আগেই বলেছি, সংস্কৃতি কেবল শিল্পকলা, সাহিত্য ও সংগীত সৃষ্টির কৌশল নয়, মৃৎপাত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং ঘরবাড়ি তৈরি করার কৌশলও সংস্কৃতির অংশ। সংস্কৃতির প্রকাশ যেমন রয়েছে। পথনাটক কিংবা পথ চলতে গুণগুণ করে গান করার মধ্যে, তেমনি রয়েছে ইতালির রেনেসাঁ যুগের শিল্পী লিওনার্দ দা ভিঞ্চির অপূর্ব শিল্পকর্ম মোনালিসার মধ্যে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে বিভিন্নভাবে মানুষের বসতির স্থান। তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, কারো হয়তো মানসিক উৎকর্ষ বেশি, কারো আবার কম। এজন্য কেউ উন্নত সংস্কৃতির অধিকারী, কেউ অনুন্নত তথা পিছিয়ে থাকা সংস্কৃতির অধিকারী। প্রত্যেক জাতি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি আছে যা তাকে অন্য সমাজ থেকে স্বতন্ত্র করে রাখে। এসব কথা মনে রেখেই সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে হবে। সংস্কৃতির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
ক. সংস্কৃতি শিক্ষণের বিষয়: সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শিক্ষণের বিষয়। প্রধানত মানুষের শিক্ষালব্ধ ব্যবহারই সংস্কৃতি। কোন বংশের পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে। সংস্কৃতি মানুষের স্বভাবগত বা জন্মগত বিষয় নয়। অর্থাৎ মানুষ জন্মসূত্রে সংস্কৃতি অর্জন করে না। নবজাতক শিশুর কোন সাংস্কৃতিক ভিত্তি নেই। সে পরিবার থেকে সংস্কৃতির শিক্ষা গ্রহণ করে। এ কারণে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পরিবেশে বাস করে বলে তাদের সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
খ. সংস্কৃতি ধারণালব্ধ বিষয়: সংস্কৃতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তা ধারণালব্ধ বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিশুরা মূলত সংস্কৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, সেজন্য জন্মের পর যখন বড় কোনো শিশু চিৎকার দিয়ে উঠে, তাকে তার সংস্কৃতির অংশ বলা যায় না। কারণ শিশুর এ স্বভাব জৈবিক দিক থেকে নির্ধারিত। কিন্তু বার বার বলতে বলতে শিশু যখন 'মা' বা কোন শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে, তখন তা তার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। কোন শব্দ শিখতে পারে শিশু ঐ বিষয়ে লব্ধ ধারণা থেকে।
গ. সংস্কৃতি সামাজিক বিষয়: সংস্কৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য, এটি সামাজিক বিষয়। অর্থাৎ সংস্কৃতি হচ্ছে সার্বিক সমাজের রূপ। সমাজ ছাড়া কোনো সংস্কৃতির টিকে থাকা সম্ভব নয়। পরস্পর সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠে। সমাজের অধিকাংশ লোক যখন একই ধরনের কাজ করে তখন সে কাজ সামাজিক কাজে পরিণত হয়। সমাজের সদস্যদের আলাদা ব্যবহার থাকতে পারে, তবে তা সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতি হলো সব ব্যবহারের সামগ্রিক রূপ।
ঘ. সংস্কৃতি পরিশীলিত: অধ্যাপক ম্যাকাইভার বলেছেন, আমরা যা করি তাই সংস্কৃতি হলেও, সেটা আদর্শ সংস্কৃতি নয়। মানুষের সংস্কৃতি কথাটির ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে। বস্তুত মানুষের আচরণে যে সচেতন মান প্রকাশ পায়, তাই আদর্শ সংস্কৃতি। আমরা যা করি তা সংস্কৃতি হলেও আদর্শ সংস্কৃতি নয়।
ঙ. সংস্কৃতি বাসনা চরিতার্থকারী বিষয়: সংস্কৃতি বাসনা চরিতার্থ করার বিষয় একারণে যে, প্রত্যেক সংস্কৃতির মধ্যে সমাজের মঙ্গল বা কল্যাণ করার প্রবণতা থাকে। প্রত্যেক সংস্কৃতিরই রয়েছে শারীরবৃত্তীয় ও মনোবিদ্যাগত চাহিদা পূরণের ক্ষমতা। সংস্কৃতি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্মিলিত কর্মের দ্বারা তা বিকশিত হয় এবং অন্যের মধ্যে তার সঞ্চার ঘটে। সুতরাং বলা যায়, সংস্কৃতি বাসনা চরিতার্থকারী বিষয়- সংস্কৃতির সামাজিক অভ্যাসগুলো অবশ্যই সমষ্টিগত চাহিদা পূরণ করে।
চ. সংস্কৃতি উপযোগীকরণযোগ্য: সংস্কৃতি সমাজের বাসনা চরিতার্থ করলেও এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো উপযোগীকরণ যোগ্যতা। সংস্কৃতিকে অবশ্যই সমাজের পরিবেশের উপযোগী হতে হবে। বস্তুত একটি ভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি কোন সংস্কৃতির পক্ষে উপযোগী নাও হতে পারে। কারণ সব সংস্কৃতি সব পরিবেশের উপযোগী নয়। একথাও আবার সত্য যে, পরিবেশ সব সময় সংস্কৃতির গতির দিক নির্ধারণ করে না। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল বলে একে উপযোগীকরণ যোগ্য হতে হয়।
ছ. সংস্কৃতি অখণ্ড সত্তা: সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর রয়েছে অখণ্ড সত্তা। সংস্কৃতির সকল উপাদান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, বিশুদ্ধ এবং অখণ্ড। সংগীত, শিল্পকলা, সাহিত্য, পোশাক- পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি, ভাষা প্রভৃতি আন্তঃসম্পর্ক যুক্ত। সংস্কৃতির কোন উপাদানই নিরর্থক নয়। একটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার পথ নির্ধারণের জন্য সংস্কৃতি স্বকীয় ভূমিকা পালন করে। এটা বলা যায় যে, সমাজবদ্ধ জীব হিসেবেই মানুষ তার সংস্কৃতি অর্জন করে এবং তার উৎকর্ষ সাধন করে। অভিন্ন পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলার জন্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সে কারণেই সংস্কৃতির রূপ ও প্রকৃতি সতত পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হয়।
সহজ বাংলার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url