বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ



বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ। (খ) D


উত্তর: বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের ফলে মধ্যযুগের সূচনা হয়। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তিনি বিহার জয় করেন। এতে নদীয়ার জনসাধারণের মধ্যে ভীতি ঢুকে যায়, তাদের মনে তুর্কি ভীতি স্থায়ী ভিত্তি লাভ করে। মাত্র ১৭/১৮ জন সৈন্য নিয়ে তিনি নদীয়া আক্রমণ করেন। নদীয়ার মানুষ তাঁকে অশ্ববিক্রেতা ভেবে বিনা বাধায় লক্ষ্মণসেনের প্রাসাদে ঢুকতে দেয়। আক্রমণের খবর পেয়ে লক্ষ্মনসেন পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। বখতিয়ার খিলজী লক্ষ্মনসেনের প্রাসাদ দখল করে নেন। ইতোমধ্যে বাকি সৈন্যেরা নদীয়ায় প্রবেশ করে। এভাবেই নদীয়া মুসলিম অধিকারে আসে।

নদীয়া দখলের পর তিনি গৌড়ের দিকে অগ্রসন হন এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। গৌড় জয়ের পর বখতিয়ার খিলজী পূর্ব ও উত্তর বাংলায় প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি নতুন প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে সুশাসনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাজ্যকে তিনি কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন। তিনি অধিকৃত অঞ্চলকে ছয়টি সরকারে বিভক্ত করেন এবং সীমান্ত ঘাঁটিসহ ও সেগুলো বিভিন্ন সহযোগী সমর নায়কের হাতে ন্যস্ত করেন। তারা সকলেই তুর্কি ও খিলজী ছিলেন। বখতিয়ার খিলজী নিজ নামে মুদ্রা বের করেন, মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। মসজিদে খোত্ত্বা পাঠের ব্যবস্থা করেন। তিব্বত অভিযানে বের হয়ে জনৈক মেচ প্রধানকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং তাঁর সহযোগিতায় ব্রহ্মপুত্র পার হয়। ধর্মান্তরের পর তার নাম হয় 'আলী' এবং আলী নতুন এভুর প্রতি আনুগত্য বজায় রাখে। অনুমিত হয় যে, আলীর সাথে তার গোত্রের লোকেরাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এদেশে ইসলাম ধর্ম বিকাশ লাভ করে তুর্কি বিজয়ের পর থেকেই।


একনায়কত্বের শাসন, মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, মুদ্রা ইত্যাদি এদেশের মানুষের কাছে অভিনব ছিল না, এগুলোকে বৌদ্ধ হিন্দু যুগে প্রচলিত প্রথা প্রতিষ্ঠানের সমান্তরাল প্রথা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যায়। খিলজী শাসন পদ্ধতিকে গোত্রীয় সামন্তবাদ বলা যায়। মামলুক ও বলবন বংশের সুলতানগণও গোত্রীয় অথবা বংশীয় সামন্তবাদকে অনুসরণ করেন। এরূপ শাসন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি বণ্টন, পৃষ্ঠপোষকতা দান, পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন ইত্যাদির সম্ভাবনা বেশি থাকে। ভাগ্যান্বেষী ও উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিগণ রাষ্ট্রনায়কের আনুগত্য অর্জন করতে এবং তা বজায় রাখতে চেষ্টা করেন।


মসজিদ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বাসীদের আবেগ ও সংস্কার ধরে রাখে। সুলতান, প্রশাসক, ধর্মীয় নেতা, ধনী ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করে তা পরিচালনার জন্য ইমাম, মুয়াজ্জিন নিয়োগ করতেন। মসজিদে শিলালিপি অথবা দেয়াললিপি থাকে; দিনে রাতে পাঁচবার আজান দেওয়া হয়, নামাজ পড়া হয়। জুমার নামাজে খোতবা পাঠের পর তার ব্যাখ্যা করা হয়। একটি মসজিদ নির্মাণের অর্থ হলো ধর্মকে দেশের মাটির ও মানুষের অতি কাছে নিয়ে যাওয়া এবং ভূমির উপর দৃঢ় ভিত্তি দেওয়া। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার ও বিস্তারে পীর দরবেশদের ভূমিকা সুবিদিত। ধর্মচর্চা ও প্রচারের ব্যাপারে সুলতান ও শাসক শ্রেণির সীমাবদ্ধতা ছিল। বাংলাদেশে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরব, ইরান, ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে বিভিন্ন মুসলমান দলে দলে আসতে থাকে। শুধু ইসলাম প্রচারই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। কেউ আসে রাজ্য শাসনের জন্য, আবার কেউ এসেছে বাণিজ্য করতে। স্থলপথে বণিকের গমনাগমন ও বাণিজ্যিক ছাড়পত্র ছিল। বাংলার পশ্চিম সীমান্তে 'তুরস্ক দণ্ড' নামে একপ্রকার করের প্রচলন ছিল। স্থানীয় রাজার সেনাবাহিনীতে যেসব তুর্কি চাকরি করতো, তাদের ঐ কর দিতে হতো। তুর্কি বিজয়ের ফলে পূর্বের বণিক, সৈনিক, আলেম শ্রেণির সাথে শাসক শ্রেণির সংখ্যা যুক্ত হয়, সৈনিকের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। অধিক বণিক ও আলেম দরবেশদের আগমনের পথ সুগম ও প্রশস্ত হয়।


বাংলার শাসকগণ নতুন অঞ্চল দখল করে সেখানে একজন মালি, একজন কাজি, একজন থানাদার, কিছু সৈন্য, মসজিদে ইমাম মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসায় মখদুম ইত্যাদি নিয়োগ করতেন। সুলতানদের জনসংযোগ খুবই সীমাবদ্ধ ছিল, দুর্গের বাইরে তাদের গতিবিধি ছিল না। পীর দরবেশগণ ছিলেন ধর্মানুরাগী এবং ধর্মপ্রচারে নিবেদিত প্রাণ। তাঁরা ধর্মপ্রচারের আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপনা নিয়ে পরিবার পরিজন মাতৃভূমি ত্যাগ করে দেশান্তরে গমন করেন। সুতরাং টা এবং ধর্মপ্রচারকে তাঁরা পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করতেন। বঙ্গ বিজয়ের পূর্বে এবং বিজয়োত্তর কালে বাংলাদেশে যেসব ঐতিহাসিক সুফি দরবেশ আগমন করেন তাঁদের ব‍্যক্তিজীবন কর্মধার পর্যালোচনা করলে আমরা এরূপই চিত্র পাই। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে কত সুফি দরবেশ বাংলায় বসবাস গড়ে তোলেন তার সঠিক হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। এঁদের মধ্যে মখদুম শাহ দৌলা, জাফর খান গাজী, শাহ সফিউদ্দীন হিন্দু রাজার সাথে যুদ্ধে নিহত হন। শেখ জালাল, শেখ শরফউদ্দিন, শাহ জালাল খানকাহ পরিচালনা করতেন। ত্রিবেণীর জাফর খান গাজী ও সিলেটের শাহ জালালের জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত। বঙ্গদেশে সুফিরা ধর্মপ্রচারের অনুকূল পরিবেশ পান। প্রথমত, রাজশক্তি তাঁদের সহায়ক ছিল। দ্বিতীয়ত, দরবেশগণ মিশনারি প্রেরণা নিয়ে ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তৃতীয়ত, ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। বাংলাদেশে বহিরাগত মুসলমানদের আগমন ঘটে মূলত দুটি কারণে; বাংলাদেশে ব্যবসায় বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ ছিল, মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে ধর্মপ্রচারের পথ সুপ্রশস্ত হয়।


পরিশেষে আমরা এরূপ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, বহিরাগত, ধর্মান্তরিত ও বৈবাহিক সূত্রে উভন্নের মিশ্রণজাত মানুষের দ্বারা বাংলার মুসলিম সমাজ গঠিত হয়, আর এ ইসলামি প্রসারের মূল দায়িত্ব পালন করে বহিরাগত মুসলমানেরাই। পীর দরবেশগণ ধর্মান্তরকরণেও সমাজ গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। সুফিমতের অনুসারীরা বাংলা সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে আসেন। সাহিত্যের উপাদান সংগৃহীত হয়েছে আরবি ফারসি উৎস থেকে। শাসক ও উচ্চবিত্তের মানুষ তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সহজ বাংলার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url