সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি বর্ণনা কর।

সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি বর্ণনা কর।

অথবা, ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে বর্ণনা কর। (খ) D



উত্তর:
ভূমিকা:
ভারতবর্ষের ইতিহাস তথা বাঙালি জাতির ইতিহাস হলো আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়েই বাঙালিরা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বেনিয়াদেরকে উপমহাদেশ থেকে বিদায় করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিতাড়িত করার পর বাঙালিরা পশ্চিমাচক্রের বা শাসকচক্রের শোষণ, নির্যাতনের বিষয়ে পরিণত হয়। পশ্চিমা শাসকচক্র দেশ বিভক্তির পরেই উপলব্ধি করে যে, যে কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে আগে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে আঘাত হানতে হবে। তাই এ চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে তারা প্রথমে বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়। এ ভাষা কেঁড়ে নেওয়ার চক্রান্ত থেকেই পাকিস্তানে সংঘটিত হয় ভাষা আন্দোলনের।


ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বা পটভূমি: নিচে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. ভাষার উপর আঘাত: পাকিস্তানি শাসনামলের প্রথম থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনুদার দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। জাতির জনক বলে খ্যাত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্ততাঁর ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত করার জন্য প্রথম ভাষার উপর আঘাত হানেন। তারা দাবি জানালো যে, উর্দু ও বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে। কারণ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক পূর্ব বাংলায় বাস করে এবং তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। কিন্তু পশ্চিমাচক্র তা প্রাধান্য দেয়নি।

২. খাজা নাজিম উদ্দিনের ঘোষণা: ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর খাজা নাজিম উদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর এ নিযুক্তি ছিল বেআইনি ও অগণতান্ত্রিক। খাজা নাজিম উদ্দিন শাসনকার্যে তেমন দক্ষ ছিলেন না। তাই শাসনতান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। খাজা নাজিম উদ্দিন ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি কায়েদে আজমের অনুকরণে ঢাকার এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।"

৩. রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন: খাজা নাজিম উদ্দিনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হলো। পরে ভাষা আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য 'সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রামপরিষদ' গঠিত হলো। এর সদস্য ছিলেন জনাব আবুল হাসিম, জনাব আতাউর রহমান খান, জনাব কামরুদ্দীন আহমদ ও জনাব তোয়াহা প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

৪. ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ: ভাষা আন্দোলনের সাহসী সৈনিক বাংলার সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষা দিবসের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে, একই দিন (২১ ফেব্রুয়ারি) ছিল পাকিস্তান সরকারের বাজেট অধিবেশনের দিন। ছাত্রদের কর্মসূচিকে বানচাল করার জন্য সরকার পূর্বেই ১৪৪ ধারা জারি করেন। এ অবস্থায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররা এক জরুরি বৈঠকে সমবেত হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালনের মধ্যদিয়ে ছাত্ররা প্রতি দশজনের একটি মিছিল বের করে। এ আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য পুলিশ বাহিনী মাঠে নামে। ফলে ছাত্র মিছিলের উপর চলে লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ। কিন্তু দেখা যায়, একপর্যায়ে এগুলো কোন কাজ করতে পারছে না, ফলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। ফলে বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকেই নিহত হয়।

৫. রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি : ভাষা আন্দোলন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন পরিষদের অধিবেশনেও চরম বাকবিতণ্ডা দেখা দেয়। এ সময় পাকিস্তানের পধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিম উদ্দিন এবং নুরুল আমীন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। এ সময় মিছিলে পুলিশের গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন আইন পরিষদে তাঁর সদস্যপদ ত্যাগ করেন। দেশের সর্বত্র সরকারের ঘৃণ্য প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ধিক্কার ধ্বনি উত্থিত হয়। সে সাথে বাঙালিদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম আরও দুর্বার গতিতে এগিয়ে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলার দেওয়ালে দেওয়ালে, পথঘাট প্রান্তরে যে রক্ত শপথের বীজ ছড়িয়ে পড়ে তার কাছে সরকারকে শেষপর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির মুখের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য নিরস্ত্র বাঙালির সশস্ত্র পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রত্যক্ষ আন্দোলন। বাঙালির মুখের ভাষা যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্য প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল। আর প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল বলে সফল হতে সক্ষম হয়। তবে এটা ছিল বিভক্তির পর বাঙালি জাতির প্রথম বিজয়। এ বিজয়ের শিক্ষা থেকে তারা আরও বেশিমাত্রায় অধিকার সচেতন হয়ে উঠে।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সহজ বাংলার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url