বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো আলোচনা কর।

বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো আলোচনা কর।

অথবা, কোন পরিস্থিতিতে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়? (খ) D



উত্তর:
বঙ্গভঙ্গের কারণসমূহ: লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার কারণ দেখিয়ে বাংলাকে বিভক্ত করলেও এর পশ্চাতে অন্যান্য কারণ নিহিত ছিল। নিচে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১. শাসনতান্ত্রিক কারণ: ১৮৬১ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুসারে সৃষ্ট 'বাংলা প্রদেশ' এর আয়তন ছিল প্রায় দুই লক্ষ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ছিল পৌনে আট কোটি। এই বিশাল প্রদেশের শাসনভার একজন গভর্নরের উপর ন্যস্ত ছিল। ফলে শাসনতান্ত্রিক শৃঙ্খলা রক্ষা ছিল দুরুহ ব্যাপার। তাই বাংলা প্রদেশকে বিভক্তিকরণে ইংরেজ সরকার সচেষ্ট হয়ে উঠে। শেষে লর্ড কার্জন বঙ্গ প্রদেশকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করেন।

২. রাজনৈতিক কারণ: বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করার পেছনে ইংরেজ শাসকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই মুখ্য ছিল। এ ব্যাপারে বিশেষ করে আমাদের এ দেশীয় লেখক, ইতিহাসবিদ সবাই প্রায় একমত। ইংরেজদের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা বানচাল করা।

বিশ শতকের প্রারম্ভে ভারতীয় জনসাধারণের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমশ প্রখর হয়ে উঠে। জাতীয় কংগ্রেসের সৃষ্টি আন্দোলনের ধারাকে আরো বেশি বেগবান করে। এক্ষেত্রে বাংলা ছিল অনেক অগ্রসর। যে কারণে সুচতুর ইংরেজ সরকার তদানীন্তন বাংলা প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বন্ধ করার জন্য নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করে।


৩. 'ভাগ কর শাসন কর নীতি': বঙ্গভঙ্গ মুসলমানদের আন্দোলন বা দাবির ফসল ছিল না। পরবর্তীকালে এর ঘোর সমর্থক ও প্রবর্তক ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ স্বয়ং নিজে শুরুতে এ ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন বা তাঁর এর প্রতি সমর্থন ছিল না। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ব্রিটিশ শাসকদের কাছ থেকে আসে। কার্যত এটি ছিল ব্রিটিশদের 'ভাগ কর শাসন কর নীতি'র (divide and Rule Policy) ফল।

বঙ্গভঙ্গ হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যা এসব জনগণকে তাদের সংখ্যাধিক্য ও উচ্চতর সংস্কৃতির বদৌলতে বঙ্গভঙ্গের ফলে সৃষ্ট জেলাসমূহ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম করবে এবং পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে এমন ঐক্য গড়ে তুলবে, যা তারা প্রাচীন মুসলমান ভাইসরয় ও রাজাদের আমলের পর আর কখনো অর্জন করতে পারেনি। লর্ড কার্জনের এ ভাষণের সারকথা ছিল হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলিম 'সেন্টিমেন্ট' জাগিয়ে তোলা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলার বিপরীতে নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলাকে দাঁড় করানো। উল্লেখ্য, কার্জন তাঁর এ সফরের সময় ঢাকার নবাবের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং 'আহসান মঞ্জিলে' রাত্রি যাপন করেন।

৪. সামাজিক কারণ : ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। ফলে ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজ তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের আশায় ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব জোরালোভাবে সমর্থন করে।

৫. অর্থনৈতিক কারণ: কলকাতাভিত্তিক সকল ব্যবসায়- বাণিজ্য চলতে থাকায় এবং শিল্প কারখানা তৈরি হওয়ায় বঙ্গ প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাসমূহ তথা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী অঞ্চলের জনসাধারণ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে কলকাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কলকাতা ছিল মূলত হিন্দু সম্প্রদায় নিয়ন্ত্রিত। যার কারণে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়। এই বৈষম্যের হাত থেকে পরিত্রাণ লাভের লক্ষ্যে মুসলমান সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে। ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লর্ড কার্জন কর্তৃক বাংলা প্রদেশ বিভক্তিকরণ বা বঙ্গভঙ্গের মূলে শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কারণই ছিল মুখ্য।

উপযুক্ত আলোচনার পরিশেষে এটাই প্রামাণিত হয় যে, বাংলায় ইংরেজদের শাসনের পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। আর এই শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বালার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সহজ বাংলার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url